দায়িত্ব

রোজ সকাল ৮টায় বাড়ি থেকে বেড়িয়ে বিকেল ৫টায় বাড়ি ফেরা, এই গতানুগতিক জীবনে দিন দিন হাফিয়ে উঠছে বন্যা। অফিসের কাজের চাপে মাঝে মাঝে দম বন্ধ হয়ে আসে। মনে হয় সব ছেড়ে ছুট্টে কোথাও হারিয়ে যায়। কিন্তু উপায় নেই। কাজকে ফাঁকি দিয়ে হারিয়ে যেতে পারলেও মাকে ফাঁকি দিয়ে যাওয়ার উপায় নেই। মা-এরতো বন্যা ছাড়া আর কেউ নেই। বাবা – মা’র একমাত্র সন্তান বন্যা। ছোট থেকে খুব আদর যত্নে মানুষ হলেও বিলাসিতা ছিল না জীবন যাপনে। ফাইনাল ইয়ার চলছিল কলেজে। দু চোখ ভরে অনেক স্বপ্ন। বিষয় ছিল বাংলা সাহিত্য। স্বপ্ন ছিল এম . এ করার পর বাংলা সাহিত্যে নাটক নিয়ে পি . এইচ . ডি করার। সেইমতো পড়াশোনা করছিল। প্রস্তুতি নিচ্ছিল।কিন্তু বিধি বাম। সবেমাত্র ফাইনাল ইয়ারের পরীক্ষা শেষ হয়েছে। সেই সময়ই বন্যার বাবা আচমকা সেরিব্রাল অ্যাটাকে বন্যাদের ছেড়ে চিরকালের জন্য চলে যান। সাজানো গোছানো সুন্দর জীবনটা এলোমেলো হয়ে গেল। সংসারের সব দায়িত্ব বন্যার ওপর এসে পড়ল। বাবা মারা যাবার পর যেন মাও কেমন হয়ে গেল। তারও সব কিছু এলোমেলো হয়ে গেল। মন খারাপের চাদরে যেন সবসময় মুড়ে রাখত নিজেকে। বন্যা সবসময় চেষ্টা করতে লাগল মাকে খুশি রাখতে, সুস্থ রাখতে। বন্যার বাবার হোসিয়ারীর ব্যবসা ছিল। সেটা বন্ধ হয়ে গেল। বন্যা সংসারের হাল ধরতে একটা প্রাইভেট কোম্পানীতে কাজে যোগ দিল।

___ কাল রবিবার। চলো মা একটু ঘুরে আসি।

___কোথায় যাবি?

___চলো একটু শপিং করে বাইরে খেয়ে আসি।

___না থাক।

___না না চলো। ফাইনাল কিন্তু। আমরা কাল বেরোবো।

এইভাবেই বন্যা মাকে সবসময় খুশি রাখার চেষ্টা করে যায়। এখনতো মায়ের ভালো মন্দ সব দায়িত্ব তারই ওপর।

আজ অফিস থেকে বন্যা তাড়াতাড়ি বেরিয়েছে। সন্দীপ বলেছে আজ দেখা করবে। অনেকদিন ওরা একসাথে সময় কাটায়নি।তাই একটু তাড়াহুড়ো করেই কাজ সেরে বন্যা অফিস থেকে বেরিয়েছে। চকবেড়িয়া বাস স্ট্যান্ডের যে ছাউনি আছে সেখানেই সন্দীপ বসে আছে। প্রায় দৌড়তে দৌড়তে বন্যা সেখানে গিয়ে দাঁড়ায়।

___একটু দেরী হয়ে গেল। সরি।

___কি আর করা যাবে। চলো।

দুজনে হাঁটতে লাগল পাশাপাশি। হাঁটতে হাঁটতে দুজনের মধ্যে অনেক কথা হলো। আসলে ওদের একটু নির্জন নিরালায় বসে ঘন্টার পর ঘণ্টা সময় কাটানোর মতো সময় কারোরই নেই। সন্দীপও বাবা-মা’র একমাত্র সন্তান। সন্দীপের ওপরও অনেক দায়িত্ব। তবে কেউই ওদের সম্পর্কের কথা বাড়িতে বলে উঠতে পারেনি।

এইভাবেই বেশ কয়েক বছর কেটে গেল। বন্যার মা এবার বন্যার বিয়ের জন্য তোড়জোড় শুরু করেছেন। মেয়ের বিয়ের বয়স হয়েছে। এবার মেয়ের একটা বিয়ে দিতে পারলে বন্যার মা নিশ্চিন্ত হতে পারে। কিন্তু বন্যার চিন্তা মাকে একা ছেড়ে কি করে সে থাকবে।

___কিরে এবার বিয়ে সংসার করতে হবে। আর কতদিন এইভাবে থাকবি।

___তোমাকে একা ছেড়ে আমি থাকবো কি করে মা!!

এদিকে সন্দীপের বাড়িতেও তার বাবা -মা বিয়ের কথা বলা শুরু করেছে। সন্দীপ তার মাকে বন্যার কথা বলে। সন্দীপের মা বলে___ঠিক আছে একদিন বন্যাকে আমাদের বাড়িতে নিয়ে আয়।

___ঠিক আছে মা।

বন্যাও তার মাকে সন্দীপের কথা বলে। বন্যার মা বলে___তোরা যদি একে অপরকে পছন্দ করিস, ভালোবাসিস তাহলে একসাথে তোরা সংসার করবি এই ব্যাপারে আমার কোন আপত্তি নেই।

অবশেষে দুই বাড়ির কথাবার্তার মাধ্যমে বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক হলো আর বেশ ধুমধাম করেই বন্যা ও সন্দীপের বিয়ে হয়ে গেল।

বন্যা মাকে ছেড়ে তার নতুন সংসারে আসল। শ্বশুর, শাশুড়ি, স্বামীকে নিয়ে বেশ গুছিয়ে সংসার করতে লাগলো। আর মাঝে মাঝে মাকে দেখে আসা, ডাক্তার দেখানোর কাজটাও করতো। এইভাবে পাঁচ বছর কেটে গেলো। সবই ঠিকঠাক চলছিল, সমস্যা হলো অন্য জায়গায়। বিয়ের পর পাঁচ বছর কেটে গেলেও বন্যা মা হতে পারছেনা। ক্রমে ক্রমে শ্বশুর, শাশুড়ির মন থেকে বন্যা দূরে সরে যেতে লাগলো। উঠতে বসতে শুনতে হতো__’আর বোধ হয় বংশধরকে দেখে যাওয়া হবেনা’। বা ‘আমাদের বংশধর কি আসবেনা’।

এরপর যত দিন যেতে লাগলো, ধারালো ছুরির মতো কথা বন্যার মনকে এফোড় ওফোড় করে দিতে লাগলো। প্রতি রাতেই চোখের জল ফেলে মাথার বালিশ ভেজাতো।সন্দীপ কখনো কখনো তাকে বোঝাতো। কখনও বা চুপ করে পাশ ফিরে শুয়ে থাকতো। ডাক্তারি রিপোর্টে বলেছে বন্যা কোনোদিন মা হতে পারবে না। কিন্তু সন্দীপ বা বন্যা সেকথা বাড়ির কাউকেই বলতে পারছেনা। বন্যা প্রতিনিয়ত পাওয়া কষ্টের মধ্যে সেদিনের আরো বেশী কষ্ট পেল যেদিন সন্দীপের মা বললেন___শোন খোকা তুই আমাদের একমাত্র সন্তান। আমাদের সব আশা আকাঙ্ক্ষা তোকে ঘিরেই। তোরা যদি একজন বংশধর দিতে না পারিস তাহলে কি করে হয়।

___কেন মা এত তাড়া কিসের?

___তাড়া! পাঁচ বছর হয়ে গেল। আমাদের কখন কি হয়ে যায়। আর কত অপেক্ষা করবো।

___মা, তুমি এসব নিয়ে চিন্তা করোনা।

___না বাবা তুই বরং বন্যাকে ডিভোর্স দে। তোর আর একটা বিয়ে দেব।

বন্যার সেদিন পায়ের তলার মাটি সরে যাচ্ছিল। কোনমতে নিজেকে সামলে ঘরের দরজা বন্ধ করে চোখের জলে কষ্টকে মোছার চেষ্টা করেছে।

___না মা এটা কি করে সম্ভব। আমি কিছুতেই বন্যাকে ছাড়তে পারবো না।

___ওঃ! তুই মাকে কষ্ট দিতে পারবি। মায়ের একটামাত্র আশা সেটাও পূরন করতে পারবিনা।

___কি বলছো মা! তোমাকে আমি কষ্ট দিচ্ছি।

___হ্যাঁ দিচ্ছিসতো।

___না মা, তোমাকে যেমন আমি ভালোবাসি। তোমার প্রতি যেমন আমার দায়ভার আছে। বন্যা আমার স্ত্রী। ওর প্রতিও আমার দায়ভার আছে। ওকেও আমি ভালোবাসি।

___আচ্ছা তাহলে তুই ভুলে যা তোর মা আছে।

এইসব কথার মাঝে বন্যা হাতে একটি সুটকেস নিয়ে মা-ছেলের সামনে এসে দাঁড়ায়।

___মা আপনার কোন চিন্তা করতে হবেনা। আমি এই সংসার, সন্দীপকে ছেড়ে চলে যাচ্ছি। আর ফিরবো না। সময়মতো আমাদের ডিভোর্স হয়ে যাবে। তারপর আপনার ছেলের আবার বিয়ে দিতে পারবেন।

___কি বলছো বন্যা, তুমি চলে যাচ্ছো মানে। আমি কি তোমাকে চলে যেতে বলেছি।

___না, সন্দীপ এতদিন তোমাদের কথামতো চলেছি। আজ না হয় একটা সিদ্ধান্ত আমি নিই।

___দাঁড়াও তুমি, আমি রেডি হয়ে আসি। তুমি যেখানে যাবে আমি পৌঁছে দিয়ে আসবো।

___তার দরকার হবেনা সন্দীপ, আমি চলে যেতে পারবো।

___না, তুমি দাঁড়াও।

কিছুক্ষণ পর সন্দীপ একটা সুটকেস হাতে আসল। বলল___মা, আমি বন্যাকে নিয়ে চলে যাচ্ছি। ওর হাত যখন ধরেছি তখন জীবনে চলার পথে ওকে একা ছেড়ে দিতে পারবোনা। ওকে যদি একা ছেড়ে দিই তাহলে নিজেকে কখনও ক্ষমা করতে পারবো না। আর তোমার কি ভালো লাগবে বলো, তুমিও তো একটা মেয়ে। মেয়ে হয়ে মেয়েদের কষ্ট বুঝলে না! না মা, আমি পারবো না। আমায় ক্ষমা করো।

বন্যা সন্দীপের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। হাতে হাত রেখে দুজনে বেরিয়ে আসল।

************************************

উদাসী মন

গর্জে উঠুক সমাজ

আর মোমবাতি প্রজ্বলন নয় চাই কঠোর প্রতিবাদ। তার আগে চাই সমাজের পুরুষদের মানসিক চরিত্র গঠনের শিক্ষা। এমন শিক্ষা যা নারীদের সন্মান করতে শেখাবে। নারীর দিকে কামনার দৃষ্টি নিবদ্ধ করার মানসিকতাকে ভোঁতা করে দেবে।

সেই মহাভারতের সময় থেকেই নারীদের অসম্মানের নিদর্শন পাওয়া যায়। কৌরবদের হাতে দ্রৌপদীর সম্মানহানির কাহিনী আমরা পড়েছি। আজ ও রোজ আমরা সংবাদ পত্রে পড়ছি নারীরা পুরুষদের দ্বারা লান্ঞ্ছিত, অসম্মানিত হচ্ছে।

NCRB এর রিপোর্ট অনুযায়ী 2018 সালে আমাদের দেশে মোট ধর্ষণের কেস ৩৩,৩৫৬। আরো বিস্ময়ের ও ভয়ঙ্কর দিক প্রতি ১৬ মিনিটে একটি করে মেয়ে ধর্ষিত হচ্ছে। এতে এটাই প্রমাণ পাওয়া যায় আমাদের দেশে মেয়েরা কতটা নিরাপত্তা হীনতার মধ্যে বেঁচে আছে।

আমাদের দেশে সমাজ বরাবরই মেয়েদের থেকে ছেলেদের মাথায় করে রাখে। কেন বলছি? বলবোনা কেন? ছেলে জন্ম হলে বৃহন্নলারা দর হাঁকে। মেয়েদের জন্মের সময়ই তাদের মূল্য নির্ধারণ করা হয়ে যায়। এখনো অনেক কন্যা ভ্রূণ হত্যা হয়।কন্যা জন্মালে তাকে হত্যা করতেও হাত কাঁপেনা।আবার এটা বলতেও দ্বিধা নেই কোন মেয়ে যদি পথে চলতে গিয়ে কোন পুরুষ এর বিকৃত রুচির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে তখন তার মা দিদি পিসিরাই বলবে, ” কি দরকার ছিল কিছু বলার, চুপচাপ সরে গেলেই তো হতো”। অনেক ক্ষেত্রে মেয়েরাই মেয়েদের কাছ থেকে ন্যুনতম সহযোগিতা, সহানুভূতি পায়না।

কোন মেয়েকে মানুষ করতে যেমন আমরা প্রথমেই ভাবি কোন ভাল স্কুলে দেব। নাচ গান শেখাব,হাতের কাজে, ঘরে বাইরে চলার ক্ষেত্রে পারদর্শী করে তুলবো। কিন্তু আমাদের এখন প্রথম ভাবনা হবে মেয়েদের আত্মরক্ষার পাঠ প্রদান বিষয়ে। সর্বোপরি প্রতিটি ছেলেকে নারীদের সন্মান প্রদানের শিক্ষার দিকে জোর দিতে হবে। ছেলেদের শৈশবকাল থেকেই সুস্হ মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। নারী পুরুষ সমান এই শিক্ষা তাদের দিতে হবে। প্রতিটি বিদ্যালয়ে মেয়েদের যেমন আত্মরক্ষার পাঠ দিতে হবে তেমন ছেলেরা যাতে সুস্থ মানসিকতা গঠনের শিক্ষা পায় সেদিকে জোর দিতে হবে, যত্নশীল হতে হবে।

এসবের পরেও কোন নারীর সাথে অসন্মানজনক ঘটনা ঘটলে প্রতিবাদ করতেই হবে, গর্জে উঠতে হবে।না হলে দেশে আরো একজন প্রিয়াঙ্কা,আরো একজন সুজেট, আরো একজন মনীষা লাঞ্ছিত হতেই থাকবে। দ্রৌপদীর সন্মান রক্ষা করতে যেমন শ্রী কৃষ্ণ অবতীর্ণ হয়েছিলেন তেমন এই যুগে আশা না করে নিজেকেই লড়াই করার শক্তিতে বলীয়ান করতে হবে।

বি.দ্র . এখানে সব পুরুষদের কথা বলা হয়নি। বিকৃত রুচির পুরুষদের কথা বলা হয়েছে।

*****************

ছবি সৌজন্যে- গুগল্।

পজিটিভ/ নেগেটিভ

শুভময় বাজার থেকে দশদিনের সব বাজার করে ঘরে ঢুকলো। সকাল ৯.৩০ বাজে। সব্জি, মুদিখানা আর শ্রীময়ীর দরকারি টুকিটাকি কিছু কিনে এনেছে। এখন যা পরিস্থিতি ঘন ঘন বাজারে যাওয়া রীতিমতো ভয়ের ব্যাপার। আর বাঙালি তো মরে গেলেও খাওয়া ছাড়ে না। বাজারের ভীড়ই সেই কথা প্রমাণ করে।

শুভময় বাজার গুলো রেখে বাথরুমে ঢুকলো। শ্রীময়ী আগেই বাথরুমে তোয়ালে রেখে দিয়েছিল। সাবান দিয়ে ভালো করে স্নান করে শুভময় ড্রয়িং রুমের সোফায় গা এলিয়ে দিল। শ্রীময়ী ফ্যান চালিয়ে দিল। যা গরম পড়েছে। ভ্যাপসা গরমে নাজেহাল অবস্থা। কদিন ধরে বৃষ্টির দেখা নেই। শুভময় বলল__ শ্রী আর এক কাপ চা হবে? খবরের কাগজ পড়তে পড়তে শুভময়ের চা খাওয়ার নেশা। রান্নাঘর থেকে শ্রীময়ী বলল__ হ্যাঁ দিচ্ছি। রুটি হয়ে গেছে একবারে ব্রেকফাস্টও করে নাও। আমি আবার সব্জি গুলো সব ধুয়ে রোদে রাখব।

__ হ্যাঁ তাহলে তাই দাও। আমি ব্রেকফাস্টটা করে নিই।

শ্রীময়ী শুভময়ের চা আগে করে দিয়ে রুটি তরকারির প্লেট ডাইনিং টেবিলে ঢাকা দিয়ে রেখে গেল। এখন এই এক জ্বালা হয়েছে। যেদিন সব বাজার আনবে ধোওয়ার মত সব জিনিস ধুয়ে রোদে রেখে আবার সব গুছিয়ে রাখতে হয়। একেতে এখন কাজের লোক আসছেনা। সব একা একা করতে হচ্ছে। তার ওপর আবার উপরি কিছু কাজ বেড়েছে। শ্রীময়ী আর পেরে ওঠে না। সেই সকাল ৬ টায় ঘুম থেকে ওঠা তারপর শুরু যুদ্ধ। যুদ্ধই বটে। ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে দৌড়ে দৌড়ে কাজ করতে হয়।

__ শ্রী আজ রুটির তরকারিটা খুব ভালো হয়েছে।

শুভময় বোঝে শ্রীময়ী এতে খুব খুশি হয়। এই গরমে সব কাজ একা হাতে করে আবার সবার জন্য রান্না করে। এর বদলে ও কিছুই চায়না। একটু প্রশংসা, একটু ভাল কথাতেই ও খুব খুশি হয়।

শ্রীময়ী বলল__ আর একটু নেবে?

__ না না, আমার খাওয়া হয়ে গিয়েছে। একটু রেখে দিও, রাতের রুটি এই তরকারি দিয়েই খাব।

__ হ্যাঁ রেখে দেব।

শুভময়ের অফিস এখন বন্ধ। বাড়িতে সময় কাটতেই চায়না। টিভি, মোবাইল, কম্পিউটার আর গল্পের বই এই হল সময় কাটানোর সঙ্গী। মাঝে মাঝে সন্ধ্যের দিকে পরিবারের সবার সাথে একটু গল্প। আর ফোনে আত্মীয় কয়েকজনের খবরাখবর নেওয়া।

শুভময় টিভি চালিয়ে বসল।

__ দেখ শ্রী আজ আমাদের রাজ্যেই ১হাজার ছাড়িয়ে গেল আক্রান্তের সংখ্যা।

শ্রীময়ী রান্না ঘর থেকেই উত্তর দিল__ হুম, দেখ আরো বাড়বে। কি যে হবে। আর ভালো লাগছে না।

শুভময় আর শ্রীময়ীরএকমাত্র সন্তান অভীক। ওরও আর কিছু ভালো লাগছে না। স্কুল নেই, পড়তে যাওয়া নেই, বাইরে বেরোতেই পারছেনা। অভীক এসে বাবার পাশে বসলো।

__ কিরে বাবু ঘুম ভাঙলো? এত বেলা অবধি ঘুমায় কেউ?

__ কি করবো? অত সকালে উঠেই বা কি করবো?

সত্যিই তো এই একঘেয়ে জীবন ওদেরই বা আর কতদিন ভাল লাগে।

__ বাবা কবে সব ঠিক হবে? আর ভালো লাগছে না।

__ কিছু বলা যাচ্ছেনা। ভ্যাকসিন না আসা পর্যন্ত কিছুই বলা যাচ্ছেনা।

__ ওহো ভগবান কিসব যে হয়ে গেল।

__ হ্যাঁরে বাবু আজ তোর অনলাইন ক্লাস নেই?

__ হ্যাঁ আছে তো, বিকালে।

__ ওঃ, যা খেয়ে আয়।

অভীক খেতে চলে গেল।

কয়েকদিন পরের ঘটনা। শুভময়ের শরীরটা খারাপ লাগতে শুরু করল। জ্বর জ্বর ভাব, শুকনো কাশি ও আছে। বাড়ির সবাই খুব চিন্তিত হয়ে পড়ল। বাড়িতেই প্যারাসিটামল, অ্যাজিথ্রাল কিনে খেতে লাগল। জ্বর কমে আবার আসে।

__ তোমার কি গলা ব্যাথাও আছে?

__ না শ্রী, গলা ব্যাথা নেই কিন্তু এই কাশি খুব কষ্ট দিচ্ছে।

শ্রীময়ী দিনে তিনবার গরম জল, গরম জলের ভ্যাপার সব কিছুর ব্যাবস্থা করে দেয়। এক সপ্তাহ হয়ে গেল শুভময়ের শরীর ঠিক হলোনা। জ্বর ১০০°এর ওপরে উঠছে না ঠিকই কিন্তু পুরো কমছেওনা।

__ বাবা, তুমি এবার টেস্টটা করিয়ে নাও।

__ হুম, তাই ভাবছি।

বাড়ির সবার ভীষণ চিন্তা, সাথে তো ভয় আছেই। কি হবে! টেস্ট করালে রিপোর্ট কি আসবে! পজিটিভ না নেগেটিভ! ভীষণ উৎকণ্ঠায় দিন কাটতে লাগল।

শুভময় হাসপাতালে গিয়ে সোয়াব টেস্ট করিয়ে আসল। ওখান থেকে বলল, ৫দিন পর রিপোর্ট বেরোবে। ততদিন হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে।

বাড়ির বাইরে কেউ বের হচ্ছেনা। প্রবল উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে। প্রত্যেকের চোখে মুখে টেনশন চেপে বসেছে। শুভময় ভাবতে লাগল যদি রিপোর্ট পজিটিভ আসে তাহলে কি করতে বলবে কে জানে। হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে নাকি বাড়িতেই থাকতে বলবে। হাসপাতালে গেলে সব কে করবে! শ্রীময়ী একা সব সামাল দিতে পারবে তো! আর সব থেকে ভয়ের ব্যাপার শুভময়ের যদি রিপোর্ট পজিটিভ আসে তাহলেতো শ্রীময়ী, অভীকেরও…………… না না আর ভাবা যাচ্ছেনা। কি হবে ঠাকুর! রক্ষা করো_এইসব সাত পাঁচ ভেবে শুভময়ের মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। এদিকে ৫টা দিন যেন কিছুতেই কাটছে না।

__ শুভ কি ভাবছ?

শ্রীময়ীর ধাক্কায় শুভময়ের সম্বিৎ ফেরে।

__ না, কি আর ভাবব। জানোইতো এখন কি ভাবনা থাকতে পারে।

__ অত ভেবোনা। কিচ্ছু হবেনা। দেখো এটা তোমার ভাইরাল ফিভার ছাড়া আর কিচ্ছু না। যদিও শ্রীময়ী বলল একথা কিন্তু টেনশন শ্রীময়ীরও হচ্ছে। তবু শ্রীময়ী কিছু বুঝতে দিচ্ছে না। শুভময়কে সাহস যোগাতে হবে যে। এই সময় মনের সাহস রাখাটা খুব জরুরি। নাহলে শরীরের ইমিউনিটি পাওয়ার কমে যেতে পারে।

একদিন দুদিন করে অবশেষে পাঁচ দিন কাটল। আজ শুভময়ের সোয়াব টেস্টের রিপোর্ট আসার কথা। সকাল ৮টায় ফোন বেজে উঠল। কারোর পা সরছেনা। অগত্যা শ্রীময়ী গিয়ে ফোনটা ধরল। প্রবল উৎকণ্ঠায় শ্রীময়ীর দিকে অভীক আর শুভময় তাকিয়ে আছে। শ্রীময়ী ওদের দিকে তাকিয়ে।

__ মা।

অভীক আর শুভময় দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।

__হ্যাঁ মা শুভর জ্বরটা এখন নেই। কিন্তু কাশি সারছেনা।আজ রিপোর্ট আসবে। তোমাকে জানাবো। এখন রাখি।

__ আচ্ছা টেনশন করিসনা।ভগবানকে ডাক।

সময় যেন কাটতে চায় না। সকাল ৮.৩০। আবার ফোন। এবারও সবাই টেনশনে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ ফোন ধরছেনা। অগত্যা শ্রীময়ীই ফোনটা ধরলো।

__ হ্যাঁ, এটা শুভময় অধিকারীর নাম্বার।

এদিকে প্রবল উৎকণ্ঠায় বাবা ছেলে শ্রীময়ীর দিকে তাকিয়ে আছে।

__ হ্যাঁ বলুন।

ফোনের অপর প্রান্তে কিছু বলল। শুনে শ্রীময়ী ও, আচ্ছা, ঠিক আছে বলে ফোন রেখে দিল।

বাবা ছেলে উৎকণ্ঠা ভরা জিজ্ঞাসু দৃষ্টি নিয়ে শ্রীময়ীর দিকে তাকিয়ে আছে।

শ্রীময়ী কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে চিৎকার করে বলে উঠল__নেগেটিভ।

আনন্দে উত্তেজনায় বাবা ছেলে একে অপরকে জড়িয়ে ধরলো। সারা জীবনে পজিটিভকে গুরুত্ব দিয়ে এসেছে। আজ জীবনে প্রথমবার নেগেটিভকে এত গুরুত্ব দিল।

*********************************** উদাসী মন

আশার আলো

আশা, জীবনের সঞ্জীবনী শক্তির আর এক নাম। জীবনে চলার পথে অনেক বাঁধার সম্মুখীন হতে হয় আমাদের। কখনো কখনো মনে হয় এই বুঝি সব শেষ, এই বুঝি আর আমি উঠে দাঁড়িয়ে সামনের দিকে অগ্রসর হতে পারবনা। কিন্তু না মনের অন্তঃস্থল হতে কেউ যেন বলে ওঠে, না থেমে গেলে চলবেনা, উঠে দাঁড়াতে হবে, অগ্রসর হতে হবে। এটাই আশা। বেঁচে থাকার আশা। এই আশা যদি না থাকে তাহলে তো জীবন লক্ষ্যহীন হয়ে পড়বে। জীবন অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে থাকবে।

বর্তমান পরিস্থিতি খুবই উদ্বেগ জনক। প্রতিটি মানুষের মন আশঙ্কায় অস্থির। সবসময় কি হয় কি হয় ভয়। চলমান জীবনের দ্বীতিয় দিনের সাক্ষী হতে পারবে কিনা সেই সংশয়ে দিন কাটছে। ভবিষ্যৎ আমাদের জন্য কি নিয়ে অপেক্ষমাণ জানিনা। তবু আমাদের আশা ছাড়লে চলবেনা। এই অন্ধকার কেটে নতুন সূর্য উঠবে। থমকে থাকা জীবন আবার গতিময় হবে। থেমে থাকা কর্মমূখী মানুষ আবার কর্মময় জীবনে ফিরবে। স্বচ্ছন্দে মানুষ মানুষের সাথে মিলিত হতে পারবে। থাকবেনা কোন সন্দেহ, থাকবেনা কোন ভয়। এই আশাটুকু জিইয়ে থাকনা মনের কোনায় তাতে তো কোন ক্ষতি নেই।

এই বছর বাচ্চাদের আর স্কুলে যাওয়া হলনা ঠিকই কিন্তু সারাবছর পড়াশোনার চাপে বাচ্চারা তাদের ইচ্ছা মতো সময় কাটাতে পারতনা, সেটা কিছুটা হলেও করতে পারছে। অনেকে অনেক প্রতিভা বিকাশের সুযোগ পেয়েছে যা এতদিন সুপ্ত অবস্থাতেই ছিল। একসময় সময়ের পিছনে আমরা ছুটে ছিলাম আজ সেই সময় আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আমরা আশা কেন ছাড়বো। আশা করতেই পারি রাতের শেষে যেমন দিন আসে, অন্ধকারের অন্য দিকে আলো থাকে তেমন দূর্দিনের পরে সুদিন আসবে।

এই আশা নিয়েই বেঁচে আছি সব কিছু একদিন ঠিক হয়ে যাবে। আবার সব স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে। সব বন্ধন ছিন্ন করবো মুক্ত বিহঙ্গের ন্যায় । আশার প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখতেই হবে। সেই আশার প্রদীপের আলোতেই আমাদের জীবন অগ্রসর হবে।

**********************************

উদাসী মন

ভালবাসা

আজ কলেজে পূনর্মিলন উৎসব। আজকের দিনটা আমাদের সবার কাছে একটি আনন্দের দিন। কত বন্ধু বান্ধবীর সাথে দেখা হবে। কত কথা, কত স্মৃতি। কলেজ জীবনের পর কে কোথায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে গিয়েছে। কারোর কারোর সাথে যোগাযোগ এখনও আছে কিন্তু সবার সাথে নেই। মনের কোনে কখনো কোন নাম উঁকি দিয়ে যায়। সে কোথায় থাকে, কেমন আছে জানিনা।

__ কিরে মানালি কেমন আছিস?

_ আরে বন্দনা তুই, আমি ভাল আছি, তুই কেমন আছিস?

__ আমি ভাল আছি। বল তোর কি খবর?এখন কোথায় থাকিস? পরিবারের খবর কি?

আরে দাঁড়া দাঁড়া সব একে একে বলবো। চল আমাদের সেই কমন রুমে গিয়ে বসি। কতদিন বসিনা।

__ হ্যাঁ চল কতদিন পর বসবো ওই ঘরটায়।

দুই বান্ধবী চলে গেল কমন রুমের দিকে। একটা টেবিলের সামনে পাশাপাশি বসে দুই বান্ধবী। অনেক গল্পকথা।

__ হ্যাঁরে বন্দনা সুমনা কেমন আছেরে?

__ সুমনার খবর তুই কিছু জানিসনা?

__ নাতো। কলেজের ফাইনাল ইয়ারের পর আরতো তেমন যোগাযোগ নেই সবার সাথে।

__হুম, কে কোথায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেল।

__ স্বপ্না, প্রীতি, মৌসুমীর সাথে যোগাযোগ আছে। স্বপ্না একটা সরকারি স্কুলে শিক্ষিকা হয়েছে।

__ আর প্রীতি? ওর কি খবর?

__ প্রীতি বিয়ে করে অস্ট্রেলিয়া আছে বরের সাথে। মাঝে মধ্যে ফোন করে, কথা হয়। ভালোই আছে।

__ আর মৌসুমী? ওকি যাকে ভালবাসাতো তার সাথেই বিয়ে হয়েছে?

__ হ্যাঁরে অঙ্কুশকেই বিয়ে করেছে। ওদের একটা মিষ্টি মেয়ে হয়েছে। ওরা উত্তর কলকাতায় থাকে। ভালোই আছে।

__ বাঃ কতদিন পর ওদের সবার কথা জানলাম।

__ কিরে বন্দনা সুমনার কথা বললিনাতো?

__ হুম, আসলে সুমনার জীবনটা ঠিক সুখের হয়নিরে।

__ কেন কি হয়েছে?

__ আসলে জানিস তো বেশি অহংকার ভাল নয়।

__ হ্যাঁ তো কি হয়েছে বলনা।

__ ওর বিয়েটা টেকেনি। শুনেছি ও নাকি আলাদা থাকে।

__ ওঃ। কেন ওর শ্বশুর বাড়ির লোক না স্বামী_কোন দিক দিয়ে সমস্যা ছিল?

__ আসলে অত কিছু জানিনারে।সেদিন শপিং মলে গিয়েছিলাম। সেখানে ওদের পাড়ার এক কাকু কাকীমার সাথে দেখা হলো। তখন সুমনার কথা জিজ্ঞেস করাতে ওনারা এইটুকুই বললেন। মানে এইটুকুই শোনা হলো। ওনারা ব্যস্ত ছিলেন। বেশী কথা হয়নি।

এই সুমনা ছিল আমাদের ব্যাচের সবথেকে সুন্দরী। কলেজের প্রায় সব ছেলেরা ওর জন্য পাগল ছিল। কিন্তু ও কাউকে পাত্তা দিত না। আকাশ বলে আমাদের এক সিনিয়র দাদা ছিল। কলেজের ইউনিয়ন লিডার ছিল। দেখতে দারুণ। যেমন হ্যান্ডসাম, তেমন স্মার্ট। দারুন গানের গলা। আকাশদা মনে মনে ভালবাসতো সুমনা কে।

__ মনে আছে বন্দনা, আকাশদাকে?

__ হ্যাঁ মনে আছে। সেই ইউনিয়ন লিডার।

__ হ্যাঁ, তোর নিশ্চয় এটাও মনে আছে যে আকাশদা সুমনাকে ভালবাসতো।

__ হ্যাঁ, কিন্তু সুমনা পাত্তা দিত না।

__ জানিস বন্দনা আজ আকাশদাকেও দেখলাম এসেছে।

__ কি সুন্দর গানের গলা আকাশদার।

এদিকে মাইকে অ্যানাউন্স হচ্ছে, এবার তোমাদের সামনে সঙ্গীত পরিবেশন করবে আমাদেরই কলেজের প্রাক্তন ছাত্র আকাশ সেন।

__ মানালি চল আকাশদা গাইবে শুনে আসি, বলে উঠল বন্দনা।

__ হ্যাঁ চল চল।

আমরা চলে গেলাম স্টেজের কাছে। আর যা দেখলাম নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। দেখলাম সেই আকাশদা আর এই আকাশদার মধ্যে আকাশ পাতাল ফারাক। আমাদের আগের আকাশদা ছিল ভীষণ হ্যান্ডসাম। সবসময় পাঞ্জাবি পরে আসত কলেজে। আর ঝকঝক করতো মুখ চোখ। হাসিখুশি থাকতো। আর আজ যেই আকাশদাকে দেখছি দাড়ি ভর্তি বিবর্ন মুখ, বিষাদ মাখা হাসি, অবসন্নতাময় চোখ। আকাশদা গান গাইতে আরম্ভ করলো। গানের গলায় আজও সেই মধু ঝরে পড়ছে। কিছুক্ষণের জন্য আমরা সবাই আকাশদার গান শুনলাম মনোমুগ্দ্ধের মতো। হাততালির আওয়াজে মুগ্ধ ভাব কাটলো। দৌড়ে গেলাম স্টেজের পেছনে। গিয়ে দেখি আকাশদা বেরিয়ে গিয়েছে।

__ যাঃ বন্দনা আকাশদার সাথে দেখা হলোনা।

একরাশ মন খারাপ নিয়ে আমরা ফিরে আসতে লাগলাম।

__ শোননা মানালি একদিন সুমনার সাথে দেখা করতে যাবি?

__ চল, তোর যদি সময় হয় তাহলে কালকেই চল।

__ হ্যাঁ আমার সময় হবে। তাহলে কাল বিকেলে যাব।

কথামত পরের দিন বন্দনা আর আমি সুমনাদের বাড়ি গেলাম। ওই দরজা খুললো। আমাদের দেখে অবাক হয়ে গেল।

__ কিরে আমি মানালি। চিনতে পারছিস?

__হ্যাঁ হ্যাঁ, কেন চিনতে পারবনা। মানালি আর বন্দনা। বস, তোরা হঠাৎ?!!

__ আরে এদিক দিয়ে যাচ্ছিলাম, ভাবলাম অনেকদিন তোর সাথে দেখা হয়না, তাই ….

__ ওঃ কি খাবি বল? চা না কফি?

__ চা খাব কিন্তু পরে। একটু গল্প করে নিই।

__ হুম। কেমন আছিস বন্দনা?

__ ভালরে।তুই?

__ আছি। চলে যাচ্ছে। আর মানালি তুই কেমন আছিস?

__ ভাল আছিরে।সুমনা তোর চোখ মুখ এত শুকনো কেন? শরীর খারাপ?

__ না না।

__ ওঃ।

বলতে বলতে একটা ফটোফ্রেমে চোখ আটকে গেল। দেখলাম আকাশদার সাথে সুমনার ছবি।

__ কিরে সুমনা তোর কি আকাশদার সাথে বিয়ে হয়েছে?

__ হ্যাঁ হয়েছিল।

__হয়েছিল মানে?

আমি কৌতুহলী হয়ে প্রশ্ন করলাম।

__হয়েছিল মানে এখন আমাদের ডিভোর্স হয়ে গিয়েছে।

আমি বন্দনার দিকে তাকালাম বন্দনা আমার দিকে তাকালো। কি বলবো বুঝে উঠতে পারছিলাম না। চারিদিকে যেন একটা গুমোট বাতাবরণ তৈরী হয়ে গেল মূহুর্তে। সুমনাই বলে উঠল, বস তোরা। আমি চা করতে বলছি। সুমনাকে দেখে মনে হল যেন ওর উঠতে বসতে খুব কষ্ট হচ্ছে। চোখের নিচে কালি, ঠোঁট দুটো ফ্যাকাশে। চা আসল। আমি চা খেতে খেতে জিজ্ঞাসাই করে ফেললাম__কিছু যদি মনে না করিস সুমনা, তাহলে জানতে পারি কি হয়েছিল যার জন্য তোদের সংসার ভেঙে গেল?আকাশদার কি কোন সমস্যা ছিল?

__না না ওর কোন সমস্যা ছিল না।

__ তাহলে? কি হয়েছিল?

সুমনার চোখ দিয়ে ঝরঝর করে জল গড়িয়ে পড়ল।

__ আসলে সমস্যাটা আমার। আমার ব্রেন ক্যান্সার ধরা পড়েছে। আমি বেশিদিন বাঁচবনা।

আমি আর বন্দনা হতবাক হয়ে গেলাম। মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। সুমনা বিড়বিড় করে বলে চলল___ আকাশ আমায় ভীষন ভালবাসে। আমিও খুব ভালবাসি। আমরা কখনো কোনদিন বিয়ের পর কেউ কাউকে কষ্ট দিইনি। খুব সুন্দর ভাবে আমাদের সংসার গুছিয়ে নিচ্ছিলাম। একটা বেবীর প্ল্যানও করছিলাম। কিন্তু তার মধ্যেই আমার এই অসুখ ধরা পড়ল। আমি ওকে জানাইনি পর্যন্ত। আমি চাইনি ওর চোখের সামনে আমি তিলে তিলে কষ্ট পেয়ে শেষ হয়ে যাই। আর ও সেটা দেখে কষ্ট পাক দিনের পর দিন।

__ সেতো বুঝলাম, কিন্তু তোদের ডিভোর্স হলো কেন?

__ আমি চাইনি ও আমার শেষের কষ্টের জীবন, বিভৎস চেহারা মনে রাখুক আর কষ্ট পাক। এর থেকে আগে থেকে আলাদা থাকার কষ্টটা অনেক ভাল। আমার প্রতি ওর রাগ হবে, কষ্টটা তুলনায় কম হবে।

__ এটা কোন কথা হল! আকাশদা তো এখনও কষ্ট পাচ্ছে।

__ হুম জানি, কিন্তু তবু ভাল ওর সেই কষ্ট আমি সামনে থেকে দেখছি না। আর ওকেও আমার তিলে তিলে শেষ হয়ে যাওয়া দেখতে হচ্ছেনা। ওকে বলেছি আবার বিয়ে করে সংসার করতে।

আমি আর বন্দনা রাস্তায় ফিরতে ফিরতে একটা কথাও বলতে পারিনি। আমি শুধু ভেবে গিয়েছি এ কেমন ভালোবাসা! কি অপরিসীম ভালোবাসা! যার জন্য দুঃখ কষ্ট একাই বহন করতে রাজি। ভালোবাসার মানুষকে শুধুই ভালোবাসতে চায়। কোন ব্যথাতুর স্মৃতি যেন ভালোবাসার মানুষের মনের কোঠায় না থাকে, সেই চেষ্টায় প্রতিনিয়ত নিজেকে নিয়োজিত রাখা। জানিনা সুমনা যা করছে ঠিক না বেঠিক। তবে যা করেছে আকাশকে ভীষন ভালোবাসে বলেই করেছে।

**************************************

__

নারী

নারী তুমি – ভালোবাসার মুক্ত আকাশ,

প্রেমিক মনের প্রকাশ।

নারী তুমি- সন্তান করো লালন,

স্নেহের পরশে করো পালন।

নারী তুমি- মমতাময়ী যেমন,

প্রতিবাদীনি তেমন।

নারী তুমি- এভারেস্ট করেছো জয়,

উচ্চতাকে পাওনি ভয়।

নারী তুমি- স্পর্শ করেছো মহাকাশ,

করেছো জেদের প্রকাশ।

নারী তুমি- একই অঙ্গে কন্যা,

মাতা, স্ত্রী, তুমি অনন্যা।

**********************

ছবি সৌজন্যে – Pinterest.com

অবাধ্য

নিজের মতো চলছে মানুষ

মানছেনা কোনো কথা,

স্বেচ্ছাচারী মনোভাবের

বিন্দু দিয়ে গাঁথা।

থাকবে নাতো বদ্ধ ঘরে

শুনবে নাতো নিষেধ,

আড্ডা দেবে পাড়ার মোড়ে

ঘুরে এসে বিদেশ।

মনের মধ্যে শৃঙ্খলা নেই

নেই কোন কিছুর ভয়,

লকডাউনটা এমনি যেন

বাঁচার জন্য নয়।

রোগটা কত ভয়ঙ্কর

মাথায় কভু ঢোকেনা,

থানা পুলিশ আইনের ভয়

বিন্দুমাত্র রোখেনা।

অবাধ্য সব অবুঝ লোক

করছে শত সহস্র ভুল,

মানছে যারা শুনছে যে লোক

তারাও দিচ্ছে ভুলের মাশুল।

**********************

করোনা

আতঙ্ক,আতঙ্ক আর আতঙ্ক,

চারিদিকে চারিপাশে আতঙ্ক।

দমবন্ধ পরিবেশ শঙ্কার নাগপাশ,

ভীতির বাতাবরন,থমকে শ্বাসপ্রশ্বাস।

বিশ্বযুদ্ধ নয়তো এযে মারণ ভাইরাস,

বাতাসে মিশেছে করোনা ভাইরাস।

বাঁচতে হলে মানতে হবে বেশ কিছু নিয়ম,

ভুগতে হবে যদি হয় একটু বেনিয়ম।

করোনার থাবা আজ সারা বিশ্বময়,

প্রার্থনা সকলের যেন দ্রুত মুক্তি হয়।

ছবি সৌজন্যে – Stock images

শৈশব-স্মৃতি

ফেলে আসা শৈশববেলা

পাবনা ফিরে আর,

মিষ্টি-মধুর স্মৃতির মেলা

কতই না তার রঙ বাহার।

ছিলনা কোন দুঃখ কষ্ট

না ছিল কোন ভার,

শুধুই ছিল আষ্টেপৃষ্ঠে

ভালোবাসা,আদর আব্দার।

ছোটবেলা কেটে গেল

বড় হওয়ার নেশায়,

কত বছর হারিয়ে গেল

জীবন গড়ার আশায়।

ছোট্ট পায়ে চলতে শেখা

মধুর কথার রেশ,

সরল ছিল জীবন রেখা

স্বপ্ন মেলার দেশ।

**************

ছবি সৌজন্যে -flckr.com