গর্জে উঠুক সমাজ

আর মোমবাতি প্রজ্বলন নয় চাই কঠোর প্রতিবাদ। তার আগে চাই সমাজের পুরুষদের মানসিক চরিত্র গঠনের শিক্ষা। এমন শিক্ষা যা নারীদের সন্মান করতে শেখাবে। নারীর দিকে কামনার দৃষ্টি নিবদ্ধ করার মানসিকতাকে ভোঁতা করে দেবে।

সেই মহাভারতের সময় থেকেই নারীদের অসম্মানের নিদর্শন পাওয়া যায়। কৌরবদের হাতে দ্রৌপদীর সম্মানহানির কাহিনী আমরা পড়েছি। আজ ও রোজ আমরা সংবাদ পত্রে পড়ছি নারীরা পুরুষদের দ্বারা লান্ঞ্ছিত, অসম্মানিত হচ্ছে।

NCRB এর রিপোর্ট অনুযায়ী 2018 সালে আমাদের দেশে মোট ধর্ষণের কেস ৩৩,৩৫৬। আরো বিস্ময়ের ও ভয়ঙ্কর দিক প্রতি ১৬ মিনিটে একটি করে মেয়ে ধর্ষিত হচ্ছে। এতে এটাই প্রমাণ পাওয়া যায় আমাদের দেশে মেয়েরা কতটা নিরাপত্তা হীনতার মধ্যে বেঁচে আছে।

আমাদের দেশে সমাজ বরাবরই মেয়েদের থেকে ছেলেদের মাথায় করে রাখে। কেন বলছি? বলবোনা কেন? ছেলে জন্ম হলে বৃহন্নলারা দর হাঁকে। মেয়েদের জন্মের সময়ই তাদের মূল্য নির্ধারণ করা হয়ে যায়। এখনো অনেক কন্যা ভ্রূণ হত্যা হয়।কন্যা জন্মালে তাকে হত্যা করতেও হাত কাঁপেনা।আবার এটা বলতেও দ্বিধা নেই কোন মেয়ে যদি পথে চলতে গিয়ে কোন পুরুষ এর বিকৃত রুচির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে তখন তার মা দিদি পিসিরাই বলবে, ” কি দরকার ছিল কিছু বলার, চুপচাপ সরে গেলেই তো হতো”। অনেক ক্ষেত্রে মেয়েরাই মেয়েদের কাছ থেকে ন্যুনতম সহযোগিতা, সহানুভূতি পায়না।

কোন মেয়েকে মানুষ করতে যেমন আমরা প্রথমেই ভাবি কোন ভাল স্কুলে দেব। নাচ গান শেখাব,হাতের কাজে, ঘরে বাইরে চলার ক্ষেত্রে পারদর্শী করে তুলবো। কিন্তু আমাদের এখন প্রথম ভাবনা হবে মেয়েদের আত্মরক্ষার পাঠ প্রদান বিষয়ে। সর্বোপরি প্রতিটি ছেলেকে নারীদের সন্মান প্রদানের শিক্ষার দিকে জোর দিতে হবে। ছেলেদের শৈশবকাল থেকেই সুস্হ মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। নারী পুরুষ সমান এই শিক্ষা তাদের দিতে হবে। প্রতিটি বিদ্যালয়ে মেয়েদের যেমন আত্মরক্ষার পাঠ দিতে হবে তেমন ছেলেরা যাতে সুস্থ মানসিকতা গঠনের শিক্ষা পায় সেদিকে জোর দিতে হবে, যত্নশীল হতে হবে।

এসবের পরেও কোন নারীর সাথে অসন্মানজনক ঘটনা ঘটলে প্রতিবাদ করতেই হবে, গর্জে উঠতে হবে।না হলে দেশে আরো একজন প্রিয়াঙ্কা,আরো একজন সুজেট, আরো একজন মনীষা লাঞ্ছিত হতেই থাকবে। দ্রৌপদীর সন্মান রক্ষা করতে যেমন শ্রী কৃষ্ণ অবতীর্ণ হয়েছিলেন তেমন এই যুগে আশা না করে নিজেকেই লড়াই করার শক্তিতে বলীয়ান করতে হবে।

বি.দ্র . এখানে সব পুরুষদের কথা বলা হয়নি। বিকৃত রুচির পুরুষদের কথা বলা হয়েছে।

*****************

ছবি সৌজন্যে- গুগল্।

পজিটিভ/ নেগেটিভ

শুভময় বাজার থেকে দশদিনের সব বাজার করে ঘরে ঢুকলো। সকাল ৯.৩০ বাজে। সব্জি, মুদিখানা আর শ্রীময়ীর দরকারি টুকিটাকি কিছু কিনে এনেছে। এখন যা পরিস্থিতি ঘন ঘন বাজারে যাওয়া রীতিমতো ভয়ের ব্যাপার। আর বাঙালি তো মরে গেলেও খাওয়া ছাড়ে না। বাজারের ভীড়ই সেই কথা প্রমাণ করে।

শুভময় বাজার গুলো রেখে বাথরুমে ঢুকলো। শ্রীময়ী আগেই বাথরুমে তোয়ালে রেখে দিয়েছিল। সাবান দিয়ে ভালো করে স্নান করে শুভময় ড্রয়িং রুমের সোফায় গা এলিয়ে দিল। শ্রীময়ী ফ্যান চালিয়ে দিল। যা গরম পড়েছে। ভ্যাপসা গরমে নাজেহাল অবস্থা। কদিন ধরে বৃষ্টির দেখা নেই। শুভময় বলল__ শ্রী আর এক কাপ চা হবে? খবরের কাগজ পড়তে পড়তে শুভময়ের চা খাওয়ার নেশা। রান্নাঘর থেকে শ্রীময়ী বলল__ হ্যাঁ দিচ্ছি। রুটি হয়ে গেছে একবারে ব্রেকফাস্টও করে নাও। আমি আবার সব্জি গুলো সব ধুয়ে রোদে রাখব।

__ হ্যাঁ তাহলে তাই দাও। আমি ব্রেকফাস্টটা করে নিই।

শ্রীময়ী শুভময়ের চা আগে করে দিয়ে রুটি তরকারির প্লেট ডাইনিং টেবিলে ঢাকা দিয়ে রেখে গেল। এখন এই এক জ্বালা হয়েছে। যেদিন সব বাজার আনবে ধোওয়ার মত সব জিনিস ধুয়ে রোদে রেখে আবার সব গুছিয়ে রাখতে হয়। একেতে এখন কাজের লোক আসছেনা। সব একা একা করতে হচ্ছে। তার ওপর আবার উপরি কিছু কাজ বেড়েছে। শ্রীময়ী আর পেরে ওঠে না। সেই সকাল ৬ টায় ঘুম থেকে ওঠা তারপর শুরু যুদ্ধ। যুদ্ধই বটে। ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে দৌড়ে দৌড়ে কাজ করতে হয়।

__ শ্রী আজ রুটির তরকারিটা খুব ভালো হয়েছে।

শুভময় বোঝে শ্রীময়ী এতে খুব খুশি হয়। এই গরমে সব কাজ একা হাতে করে আবার সবার জন্য রান্না করে। এর বদলে ও কিছুই চায়না। একটু প্রশংসা, একটু ভাল কথাতেই ও খুব খুশি হয়।

শ্রীময়ী বলল__ আর একটু নেবে?

__ না না, আমার খাওয়া হয়ে গিয়েছে। একটু রেখে দিও, রাতের রুটি এই তরকারি দিয়েই খাব।

__ হ্যাঁ রেখে দেব।

শুভময়ের অফিস এখন বন্ধ। বাড়িতে সময় কাটতেই চায়না। টিভি, মোবাইল, কম্পিউটার আর গল্পের বই এই হল সময় কাটানোর সঙ্গী। মাঝে মাঝে সন্ধ্যের দিকে পরিবারের সবার সাথে একটু গল্প। আর ফোনে আত্মীয় কয়েকজনের খবরাখবর নেওয়া।

শুভময় টিভি চালিয়ে বসল।

__ দেখ শ্রী আজ আমাদের রাজ্যেই ১হাজার ছাড়িয়ে গেল আক্রান্তের সংখ্যা।

শ্রীময়ী রান্না ঘর থেকেই উত্তর দিল__ হুম, দেখ আরো বাড়বে। কি যে হবে। আর ভালো লাগছে না।

শুভময় আর শ্রীময়ীরএকমাত্র সন্তান অভীক। ওরও আর কিছু ভালো লাগছে না। স্কুল নেই, পড়তে যাওয়া নেই, বাইরে বেরোতেই পারছেনা। অভীক এসে বাবার পাশে বসলো।

__ কিরে বাবু ঘুম ভাঙলো? এত বেলা অবধি ঘুমায় কেউ?

__ কি করবো? অত সকালে উঠেই বা কি করবো?

সত্যিই তো এই একঘেয়ে জীবন ওদেরই বা আর কতদিন ভাল লাগে।

__ বাবা কবে সব ঠিক হবে? আর ভালো লাগছে না।

__ কিছু বলা যাচ্ছেনা। ভ্যাকসিন না আসা পর্যন্ত কিছুই বলা যাচ্ছেনা।

__ ওহো ভগবান কিসব যে হয়ে গেল।

__ হ্যাঁরে বাবু আজ তোর অনলাইন ক্লাস নেই?

__ হ্যাঁ আছে তো, বিকালে।

__ ওঃ, যা খেয়ে আয়।

অভীক খেতে চলে গেল।

কয়েকদিন পরের ঘটনা। শুভময়ের শরীরটা খারাপ লাগতে শুরু করল। জ্বর জ্বর ভাব, শুকনো কাশি ও আছে। বাড়ির সবাই খুব চিন্তিত হয়ে পড়ল। বাড়িতেই প্যারাসিটামল, অ্যাজিথ্রাল কিনে খেতে লাগল। জ্বর কমে আবার আসে।

__ তোমার কি গলা ব্যাথাও আছে?

__ না শ্রী, গলা ব্যাথা নেই কিন্তু এই কাশি খুব কষ্ট দিচ্ছে।

শ্রীময়ী দিনে তিনবার গরম জল, গরম জলের ভ্যাপার সব কিছুর ব্যাবস্থা করে দেয়। এক সপ্তাহ হয়ে গেল শুভময়ের শরীর ঠিক হলোনা। জ্বর ১০০°এর ওপরে উঠছে না ঠিকই কিন্তু পুরো কমছেওনা।

__ বাবা, তুমি এবার টেস্টটা করিয়ে নাও।

__ হুম, তাই ভাবছি।

বাড়ির সবার ভীষণ চিন্তা, সাথে তো ভয় আছেই। কি হবে! টেস্ট করালে রিপোর্ট কি আসবে! পজিটিভ না নেগেটিভ! ভীষণ উৎকণ্ঠায় দিন কাটতে লাগল।

শুভময় হাসপাতালে গিয়ে সোয়াব টেস্ট করিয়ে আসল। ওখান থেকে বলল, ৫দিন পর রিপোর্ট বেরোবে। ততদিন হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে।

বাড়ির বাইরে কেউ বের হচ্ছেনা। প্রবল উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে। প্রত্যেকের চোখে মুখে টেনশন চেপে বসেছে। শুভময় ভাবতে লাগল যদি রিপোর্ট পজিটিভ আসে তাহলে কি করতে বলবে কে জানে। হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে নাকি বাড়িতেই থাকতে বলবে। হাসপাতালে গেলে সব কে করবে! শ্রীময়ী একা সব সামাল দিতে পারবে তো! আর সব থেকে ভয়ের ব্যাপার শুভময়ের যদি রিপোর্ট পজিটিভ আসে তাহলেতো শ্রীময়ী, অভীকেরও…………… না না আর ভাবা যাচ্ছেনা। কি হবে ঠাকুর! রক্ষা করো_এইসব সাত পাঁচ ভেবে শুভময়ের মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। এদিকে ৫টা দিন যেন কিছুতেই কাটছে না।

__ শুভ কি ভাবছ?

শ্রীময়ীর ধাক্কায় শুভময়ের সম্বিৎ ফেরে।

__ না, কি আর ভাবব। জানোইতো এখন কি ভাবনা থাকতে পারে।

__ অত ভেবোনা। কিচ্ছু হবেনা। দেখো এটা তোমার ভাইরাল ফিভার ছাড়া আর কিচ্ছু না। যদিও শ্রীময়ী বলল একথা কিন্তু টেনশন শ্রীময়ীরও হচ্ছে। তবু শ্রীময়ী কিছু বুঝতে দিচ্ছে না। শুভময়কে সাহস যোগাতে হবে যে। এই সময় মনের সাহস রাখাটা খুব জরুরি। নাহলে শরীরের ইমিউনিটি পাওয়ার কমে যেতে পারে।

একদিন দুদিন করে অবশেষে পাঁচ দিন কাটল। আজ শুভময়ের সোয়াব টেস্টের রিপোর্ট আসার কথা। সকাল ৮টায় ফোন বেজে উঠল। কারোর পা সরছেনা। অগত্যা শ্রীময়ী গিয়ে ফোনটা ধরল। প্রবল উৎকণ্ঠায় শ্রীময়ীর দিকে অভীক আর শুভময় তাকিয়ে আছে। শ্রীময়ী ওদের দিকে তাকিয়ে।

__ মা।

অভীক আর শুভময় দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।

__হ্যাঁ মা শুভর জ্বরটা এখন নেই। কিন্তু কাশি সারছেনা।আজ রিপোর্ট আসবে। তোমাকে জানাবো। এখন রাখি।

__ আচ্ছা টেনশন করিসনা।ভগবানকে ডাক।

সময় যেন কাটতে চায় না। সকাল ৮.৩০। আবার ফোন। এবারও সবাই টেনশনে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ ফোন ধরছেনা। অগত্যা শ্রীময়ীই ফোনটা ধরলো।

__ হ্যাঁ, এটা শুভময় অধিকারীর নাম্বার।

এদিকে প্রবল উৎকণ্ঠায় বাবা ছেলে শ্রীময়ীর দিকে তাকিয়ে আছে।

__ হ্যাঁ বলুন।

ফোনের অপর প্রান্তে কিছু বলল। শুনে শ্রীময়ী ও, আচ্ছা, ঠিক আছে বলে ফোন রেখে দিল।

বাবা ছেলে উৎকণ্ঠা ভরা জিজ্ঞাসু দৃষ্টি নিয়ে শ্রীময়ীর দিকে তাকিয়ে আছে।

শ্রীময়ী কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে চিৎকার করে বলে উঠল__নেগেটিভ।

আনন্দে উত্তেজনায় বাবা ছেলে একে অপরকে জড়িয়ে ধরলো। সারা জীবনে পজিটিভকে গুরুত্ব দিয়ে এসেছে। আজ জীবনে প্রথমবার নেগেটিভকে এত গুরুত্ব দিল।

*********************************** উদাসী মন

আশার আলো

আশা, জীবনের সঞ্জীবনী শক্তির আর এক নাম। জীবনে চলার পথে অনেক বাঁধার সম্মুখীন হতে হয় আমাদের। কখনো কখনো মনে হয় এই বুঝি সব শেষ, এই বুঝি আর আমি উঠে দাঁড়িয়ে সামনের দিকে অগ্রসর হতে পারবনা। কিন্তু না মনের অন্তঃস্থল হতে কেউ যেন বলে ওঠে, না থেমে গেলে চলবেনা, উঠে দাঁড়াতে হবে, অগ্রসর হতে হবে। এটাই আশা। বেঁচে থাকার আশা। এই আশা যদি না থাকে তাহলে তো জীবন লক্ষ্যহীন হয়ে পড়বে। জীবন অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে থাকবে।

বর্তমান পরিস্থিতি খুবই উদ্বেগ জনক। প্রতিটি মানুষের মন আশঙ্কায় অস্থির। সবসময় কি হয় কি হয় ভয়। চলমান জীবনের দ্বীতিয় দিনের সাক্ষী হতে পারবে কিনা সেই সংশয়ে দিন কাটছে। ভবিষ্যৎ আমাদের জন্য কি নিয়ে অপেক্ষমাণ জানিনা। তবু আমাদের আশা ছাড়লে চলবেনা। এই অন্ধকার কেটে নতুন সূর্য উঠবে। থমকে থাকা জীবন আবার গতিময় হবে। থেমে থাকা কর্মমূখী মানুষ আবার কর্মময় জীবনে ফিরবে। স্বচ্ছন্দে মানুষ মানুষের সাথে মিলিত হতে পারবে। থাকবেনা কোন সন্দেহ, থাকবেনা কোন ভয়। এই আশাটুকু জিইয়ে থাকনা মনের কোনায় তাতে তো কোন ক্ষতি নেই।

এই বছর বাচ্চাদের আর স্কুলে যাওয়া হলনা ঠিকই কিন্তু সারাবছর পড়াশোনার চাপে বাচ্চারা তাদের ইচ্ছা মতো সময় কাটাতে পারতনা, সেটা কিছুটা হলেও করতে পারছে। অনেকে অনেক প্রতিভা বিকাশের সুযোগ পেয়েছে যা এতদিন সুপ্ত অবস্থাতেই ছিল। একসময় সময়ের পিছনে আমরা ছুটে ছিলাম আজ সেই সময় আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আমরা আশা কেন ছাড়বো। আশা করতেই পারি রাতের শেষে যেমন দিন আসে, অন্ধকারের অন্য দিকে আলো থাকে তেমন দূর্দিনের পরে সুদিন আসবে।

এই আশা নিয়েই বেঁচে আছি সব কিছু একদিন ঠিক হয়ে যাবে। আবার সব স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে। সব বন্ধন ছিন্ন করবো মুক্ত বিহঙ্গের ন্যায় । আশার প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখতেই হবে। সেই আশার প্রদীপের আলোতেই আমাদের জীবন অগ্রসর হবে।

**********************************

উদাসী মন

ভালবাসা

আজ কলেজে পূনর্মিলন উৎসব। আজকের দিনটা আমাদের সবার কাছে একটি আনন্দের দিন। কত বন্ধু বান্ধবীর সাথে দেখা হবে। কত কথা, কত স্মৃতি। কলেজ জীবনের পর কে কোথায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে গিয়েছে। কারোর কারোর সাথে যোগাযোগ এখনও আছে কিন্তু সবার সাথে নেই। মনের কোনে কখনো কোন নাম উঁকি দিয়ে যায়। সে কোথায় থাকে, কেমন আছে জানিনা।

__ কিরে মানালি কেমন আছিস?

_ আরে বন্দনা তুই, আমি ভাল আছি, তুই কেমন আছিস?

__ আমি ভাল আছি। বল তোর কি খবর?এখন কোথায় থাকিস? পরিবারের খবর কি?

আরে দাঁড়া দাঁড়া সব একে একে বলবো। চল আমাদের সেই কমন রুমে গিয়ে বসি। কতদিন বসিনা।

__ হ্যাঁ চল কতদিন পর বসবো ওই ঘরটায়।

দুই বান্ধবী চলে গেল কমন রুমের দিকে। একটা টেবিলের সামনে পাশাপাশি বসে দুই বান্ধবী। অনেক গল্পকথা।

__ হ্যাঁরে বন্দনা সুমনা কেমন আছেরে?

__ সুমনার খবর তুই কিছু জানিসনা?

__ নাতো। কলেজের ফাইনাল ইয়ারের পর আরতো তেমন যোগাযোগ নেই সবার সাথে।

__হুম, কে কোথায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেল।

__ স্বপ্না, প্রীতি, মৌসুমীর সাথে যোগাযোগ আছে। স্বপ্না একটা সরকারি স্কুলে শিক্ষিকা হয়েছে।

__ আর প্রীতি? ওর কি খবর?

__ প্রীতি বিয়ে করে অস্ট্রেলিয়া আছে বরের সাথে। মাঝে মধ্যে ফোন করে, কথা হয়। ভালোই আছে।

__ আর মৌসুমী? ওকি যাকে ভালবাসাতো তার সাথেই বিয়ে হয়েছে?

__ হ্যাঁরে অঙ্কুশকেই বিয়ে করেছে। ওদের একটা মিষ্টি মেয়ে হয়েছে। ওরা উত্তর কলকাতায় থাকে। ভালোই আছে।

__ বাঃ কতদিন পর ওদের সবার কথা জানলাম।

__ কিরে বন্দনা সুমনার কথা বললিনাতো?

__ হুম, আসলে সুমনার জীবনটা ঠিক সুখের হয়নিরে।

__ কেন কি হয়েছে?

__ আসলে জানিস তো বেশি অহংকার ভাল নয়।

__ হ্যাঁ তো কি হয়েছে বলনা।

__ ওর বিয়েটা টেকেনি। শুনেছি ও নাকি আলাদা থাকে।

__ ওঃ। কেন ওর শ্বশুর বাড়ির লোক না স্বামী_কোন দিক দিয়ে সমস্যা ছিল?

__ আসলে অত কিছু জানিনারে।সেদিন শপিং মলে গিয়েছিলাম। সেখানে ওদের পাড়ার এক কাকু কাকীমার সাথে দেখা হলো। তখন সুমনার কথা জিজ্ঞেস করাতে ওনারা এইটুকুই বললেন। মানে এইটুকুই শোনা হলো। ওনারা ব্যস্ত ছিলেন। বেশী কথা হয়নি।

এই সুমনা ছিল আমাদের ব্যাচের সবথেকে সুন্দরী। কলেজের প্রায় সব ছেলেরা ওর জন্য পাগল ছিল। কিন্তু ও কাউকে পাত্তা দিত না। আকাশ বলে আমাদের এক সিনিয়র দাদা ছিল। কলেজের ইউনিয়ন লিডার ছিল। দেখতে দারুণ। যেমন হ্যান্ডসাম, তেমন স্মার্ট। দারুন গানের গলা। আকাশদা মনে মনে ভালবাসতো সুমনা কে।

__ মনে আছে বন্দনা, আকাশদাকে?

__ হ্যাঁ মনে আছে। সেই ইউনিয়ন লিডার।

__ হ্যাঁ, তোর নিশ্চয় এটাও মনে আছে যে আকাশদা সুমনাকে ভালবাসতো।

__ হ্যাঁ, কিন্তু সুমনা পাত্তা দিত না।

__ জানিস বন্দনা আজ আকাশদাকেও দেখলাম এসেছে।

__ কি সুন্দর গানের গলা আকাশদার।

এদিকে মাইকে অ্যানাউন্স হচ্ছে, এবার তোমাদের সামনে সঙ্গীত পরিবেশন করবে আমাদেরই কলেজের প্রাক্তন ছাত্র আকাশ সেন।

__ মানালি চল আকাশদা গাইবে শুনে আসি, বলে উঠল বন্দনা।

__ হ্যাঁ চল চল।

আমরা চলে গেলাম স্টেজের কাছে। আর যা দেখলাম নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। দেখলাম সেই আকাশদা আর এই আকাশদার মধ্যে আকাশ পাতাল ফারাক। আমাদের আগের আকাশদা ছিল ভীষণ হ্যান্ডসাম। সবসময় পাঞ্জাবি পরে আসত কলেজে। আর ঝকঝক করতো মুখ চোখ। হাসিখুশি থাকতো। আর আজ যেই আকাশদাকে দেখছি দাড়ি ভর্তি বিবর্ন মুখ, বিষাদ মাখা হাসি, অবসন্নতাময় চোখ। আকাশদা গান গাইতে আরম্ভ করলো। গানের গলায় আজও সেই মধু ঝরে পড়ছে। কিছুক্ষণের জন্য আমরা সবাই আকাশদার গান শুনলাম মনোমুগ্দ্ধের মতো। হাততালির আওয়াজে মুগ্ধ ভাব কাটলো। দৌড়ে গেলাম স্টেজের পেছনে। গিয়ে দেখি আকাশদা বেরিয়ে গিয়েছে।

__ যাঃ বন্দনা আকাশদার সাথে দেখা হলোনা।

একরাশ মন খারাপ নিয়ে আমরা ফিরে আসতে লাগলাম।

__ শোননা মানালি একদিন সুমনার সাথে দেখা করতে যাবি?

__ চল, তোর যদি সময় হয় তাহলে কালকেই চল।

__ হ্যাঁ আমার সময় হবে। তাহলে কাল বিকেলে যাব।

কথামত পরের দিন বন্দনা আর আমি সুমনাদের বাড়ি গেলাম। ওই দরজা খুললো। আমাদের দেখে অবাক হয়ে গেল।

__ কিরে আমি মানালি। চিনতে পারছিস?

__হ্যাঁ হ্যাঁ, কেন চিনতে পারবনা। মানালি আর বন্দনা। বস, তোরা হঠাৎ?!!

__ আরে এদিক দিয়ে যাচ্ছিলাম, ভাবলাম অনেকদিন তোর সাথে দেখা হয়না, তাই ….

__ ওঃ কি খাবি বল? চা না কফি?

__ চা খাব কিন্তু পরে। একটু গল্প করে নিই।

__ হুম। কেমন আছিস বন্দনা?

__ ভালরে।তুই?

__ আছি। চলে যাচ্ছে। আর মানালি তুই কেমন আছিস?

__ ভাল আছিরে।সুমনা তোর চোখ মুখ এত শুকনো কেন? শরীর খারাপ?

__ না না।

__ ওঃ।

বলতে বলতে একটা ফটোফ্রেমে চোখ আটকে গেল। দেখলাম আকাশদার সাথে সুমনার ছবি।

__ কিরে সুমনা তোর কি আকাশদার সাথে বিয়ে হয়েছে?

__ হ্যাঁ হয়েছিল।

__হয়েছিল মানে?

আমি কৌতুহলী হয়ে প্রশ্ন করলাম।

__হয়েছিল মানে এখন আমাদের ডিভোর্স হয়ে গিয়েছে।

আমি বন্দনার দিকে তাকালাম বন্দনা আমার দিকে তাকালো। কি বলবো বুঝে উঠতে পারছিলাম না। চারিদিকে যেন একটা গুমোট বাতাবরণ তৈরী হয়ে গেল মূহুর্তে। সুমনাই বলে উঠল, বস তোরা। আমি চা করতে বলছি। সুমনাকে দেখে মনে হল যেন ওর উঠতে বসতে খুব কষ্ট হচ্ছে। চোখের নিচে কালি, ঠোঁট দুটো ফ্যাকাশে। চা আসল। আমি চা খেতে খেতে জিজ্ঞাসাই করে ফেললাম__কিছু যদি মনে না করিস সুমনা, তাহলে জানতে পারি কি হয়েছিল যার জন্য তোদের সংসার ভেঙে গেল?আকাশদার কি কোন সমস্যা ছিল?

__না না ওর কোন সমস্যা ছিল না।

__ তাহলে? কি হয়েছিল?

সুমনার চোখ দিয়ে ঝরঝর করে জল গড়িয়ে পড়ল।

__ আসলে সমস্যাটা আমার। আমার ব্রেন ক্যান্সার ধরা পড়েছে। আমি বেশিদিন বাঁচবনা।

আমি আর বন্দনা হতবাক হয়ে গেলাম। মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। সুমনা বিড়বিড় করে বলে চলল___ আকাশ আমায় ভীষন ভালবাসে। আমিও খুব ভালবাসি। আমরা কখনো কোনদিন বিয়ের পর কেউ কাউকে কষ্ট দিইনি। খুব সুন্দর ভাবে আমাদের সংসার গুছিয়ে নিচ্ছিলাম। একটা বেবীর প্ল্যানও করছিলাম। কিন্তু তার মধ্যেই আমার এই অসুখ ধরা পড়ল। আমি ওকে জানাইনি পর্যন্ত। আমি চাইনি ওর চোখের সামনে আমি তিলে তিলে কষ্ট পেয়ে শেষ হয়ে যাই। আর ও সেটা দেখে কষ্ট পাক দিনের পর দিন।

__ সেতো বুঝলাম, কিন্তু তোদের ডিভোর্স হলো কেন?

__ আমি চাইনি ও আমার শেষের কষ্টের জীবন, বিভৎস চেহারা মনে রাখুক আর কষ্ট পাক। এর থেকে আগে থেকে আলাদা থাকার কষ্টটা অনেক ভাল। আমার প্রতি ওর রাগ হবে, কষ্টটা তুলনায় কম হবে।

__ এটা কোন কথা হল! আকাশদা তো এখনও কষ্ট পাচ্ছে।

__ হুম জানি, কিন্তু তবু ভাল ওর সেই কষ্ট আমি সামনে থেকে দেখছি না। আর ওকেও আমার তিলে তিলে শেষ হয়ে যাওয়া দেখতে হচ্ছেনা। ওকে বলেছি আবার বিয়ে করে সংসার করতে।

আমি আর বন্দনা রাস্তায় ফিরতে ফিরতে একটা কথাও বলতে পারিনি। আমি শুধু ভেবে গিয়েছি এ কেমন ভালোবাসা! কি অপরিসীম ভালোবাসা! যার জন্য দুঃখ কষ্ট একাই বহন করতে রাজি। ভালোবাসার মানুষকে শুধুই ভালোবাসতে চায়। কোন ব্যথাতুর স্মৃতি যেন ভালোবাসার মানুষের মনের কোঠায় না থাকে, সেই চেষ্টায় প্রতিনিয়ত নিজেকে নিয়োজিত রাখা। জানিনা সুমনা যা করছে ঠিক না বেঠিক। তবে যা করেছে আকাশকে ভীষন ভালোবাসে বলেই করেছে।

**************************************

__

নারী

নারী তুমি – ভালোবাসার মুক্ত আকাশ,

প্রেমিক মনের প্রকাশ।

নারী তুমি- সন্তান করো লালন,

স্নেহের পরশে করো পালন।

নারী তুমি- মমতাময়ী যেমন,

প্রতিবাদীনি তেমন।

নারী তুমি- এভারেস্ট করেছো জয়,

উচ্চতাকে পাওনি ভয়।

নারী তুমি- স্পর্শ করেছো মহাকাশ,

করেছো জেদের প্রকাশ।

নারী তুমি- একই অঙ্গে কন্যা,

মাতা, স্ত্রী, তুমি অনন্যা।

**********************

ছবি সৌজন্যে – Pinterest.com

অবাধ্য

নিজের মতো চলছে মানুষ

মানছেনা কোনো কথা,

স্বেচ্ছাচারী মনোভাবের

বিন্দু দিয়ে গাঁথা।

থাকবে নাতো বদ্ধ ঘরে

শুনবে নাতো নিষেধ,

আড্ডা দেবে পাড়ার মোড়ে

ঘুরে এসে বিদেশ।

মনের মধ্যে শৃঙ্খলা নেই

নেই কোন কিছুর ভয়,

লকডাউনটা এমনি যেন

বাঁচার জন্য নয়।

রোগটা কত ভয়ঙ্কর

মাথায় কভু ঢোকেনা,

থানা পুলিশ আইনের ভয়

বিন্দুমাত্র রোখেনা।

অবাধ্য সব অবুঝ লোক

করছে শত সহস্র ভুল,

মানছে যারা শুনছে যে লোক

তারাও দিচ্ছে ভুলের মাশুল।

**********************

করোনা

আতঙ্ক,আতঙ্ক আর আতঙ্ক,

চারিদিকে চারিপাশে আতঙ্ক।

দমবন্ধ পরিবেশ শঙ্কার নাগপাশ,

ভীতির বাতাবরন,থমকে শ্বাসপ্রশ্বাস।

বিশ্বযুদ্ধ নয়তো এযে মারণ ভাইরাস,

বাতাসে মিশেছে করোনা ভাইরাস।

বাঁচতে হলে মানতে হবে বেশ কিছু নিয়ম,

ভুগতে হবে যদি হয় একটু বেনিয়ম।

করোনার থাবা আজ সারা বিশ্বময়,

প্রার্থনা সকলের যেন দ্রুত মুক্তি হয়।

ছবি সৌজন্যে – Stock images

শৈশব-স্মৃতি

ফেলে আসা শৈশববেলা

পাবনা ফিরে আর,

মিষ্টি-মধুর স্মৃতির মেলা

কতই না তার রঙ বাহার।

ছিলনা কোন দুঃখ কষ্ট

না ছিল কোন ভার,

শুধুই ছিল আষ্টেপৃষ্ঠে

ভালোবাসা,আদর আব্দার।

ছোটবেলা কেটে গেল

বড় হওয়ার নেশায়,

কত বছর হারিয়ে গেল

জীবন গড়ার আশায়।

ছোট্ট পায়ে চলতে শেখা

মধুর কথার রেশ,

সরল ছিল জীবন রেখা

স্বপ্ন মেলার দেশ।

**************

ছবি সৌজন্যে -flckr.com

ফাগুন পলাশ

এই ফাগুনে তোমায় দিলাম

ভালোবাসার রঙিন পলাশ,

অনুভবের ভাষায় দিলাম

ভালোবাসার মিষ্টি সুবাস।

মিলনসুখে মাতোয়ারা

বাঁধনছেঁড়া হৃদয় দুটি,

ফাগুন হাওয়ায় আত্মহারা

পলাশ বনে পড়িছে লুটি।

ফাগুনের জ্যোৎস্না রাতে

অভিসারে দুইটি মন,

মিলন আশার ভাবনাতে

দুই হৃদয়ের সম্ভাষণ।

****************

ছবি সৌজন্যে…pinterest.com

অনুশোচনা

‘এই যে জুতোটা এখানে কেউ রাখে’- বাথরুম থেকে বেড়িয়েই নীতাকে এই কথা শুনতে হলো।’কেনো কোথায় রাখবো?’ নীতাও রেগে গিয়ে বললো।

সুজয় বরাবর এইরকমই।সবসময় নীতার দোষ খুঁজে বেরায়।আর ভাবে যা বলছে তা নীতার ভালোর জন্যই।ঘরে আসলেই সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়ে যায় এটা এরকম কেন,ওটা ওখানে কেনো,কেন এটা করেছো,কেন ওটা করোনি- ধরনের নানা অভিযোগ,রোজ রোজ এই অভিযোগ শুনতে শুনতে নীতা ক্লান্ত বিধ্বস্ত হয়ে পড়ছে।দিন দিন সে অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। সেদিকে সুজয়ের কোনো খেয়ালই নেয়।সে থাকে তার মেজাজ নিয়ে। এই নিয়ে নীতার মনে ভীষণ অশান্তি চলে। মাঝে মাঝে এত কষ্ট পায়, ঠাকুরকে বলে,’আমাকে তুলে নাও তোমার কাছে’।

সুজয় যেমন তার ব্যবসার কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকে।নীতাও সারাদিন সংসারের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকে।সুজয়ের কাজ যেমন মাথা খাটানোর। কিন্তু নীতার মাথা খাটানোর সঙ্গে সঙ্গে কায়িক পরিশ্রমও করতে হয়। সেটা কে বোঝে!

দুই ছেলেমেয়ের মা নীতা।মেয়ে তন্বিষ্ঠা ক্লাস টেনে পড়ে।ছেলে তন্ময়ের ক্লাস টু।তারপর ছেলে ভীষণ দুষ্টু। তাকে সামলাতেই নীতার সমস্ত শক্তি ফুরিয়ে যায়। সুজয় কি সেটা বোঝেনা?নীতা কিছুতেই বুঝতে পারে না। মাঝে মাঝে নীতা ভীষণ একা হয়ে পড়ে।মনে মনে বলে,’ভগবান আমি কাদের জন্য এত খাঁটি, সারাদিন এই রান্নাঘরে আর বাড়ির চৌহদ্দিতেই কাটিয়ে দিই।’কখনও কখনও ঠাকুরঘরেও বসে কান্না করে।

কিন্তু যখন নীতা বিয়ে হয়ে প্রথম শ্বশুরবাড়িতে এসেছিল। আর পাঁচটা মেয়ের মতোই অনেক স্বপ্ন নিয়ে এসেছিল।মনে মনে স্বপ্ন সাজিয়েছিল। স্বামীকে নিয়ে সুখে শান্তিতে ঘর করবে। স্বামীকে নিয়ে মোটামুটি ২-৩ বছর শান্তিতেই ঘর করেছে।যদিও তার মধ্যে কখনও সখনও মনোমালিন্য -মিষ্টি মান-অভিমানের পালা চলেছে। তবে সেগুলোতো স্বামী -স্ত্রীর সম্পর্ককে আরো মজবুত করে তোলে। কিন্তু নীতার হ্মেত্রে হয়েছে উল্টো। যতদিন গিয়েছে সুজয় যেন খিটখিটে স্বভাবের হয়ে উঠেছে। ভালোবাসার ছোঁয়া যদি একদিন থাকে সপ্তাহের ছয়দিনই থাকে অশান্তির মেঘ নীতা আর সুজয়ের সংসারে।অথচ যখন নীতার বিয়ে ঠিক হয় নীতার মা নীতাকে বলেছিল, ‘শোন শ্বশুরবাড়িতে তুই শুধু স্বামীকেই ভালোবাসবি তা নয় কিন্তু সংসারের সবাইকে ভালোবাসবি দেখবি তারাও তোকে ভালোবাসবে।’নীতা তাই ভাবে -মা আমি কি বোকা মেয়ে তোমার। ভালোবেসেও সবার ভালোবাসা পেলামনা। সত্যিই আমি কি বোকা! হঠাৎ নীতার সম্বিৎ ফেরে কিছু পড়ে যাওয়ার শব্দে।ছুটে যায় নীতা।দেখে তার দুষ্টু ছেলে তার শখের ফুলদানিটা মেঝেতে ফেলে দিয়েছে আর সেটা ভেঙে চৌচির হয়ে গিয়েছে। ঠিক যেমন নীতার মনটা ভেঙে চৌচির হয়ে গিয়েছে।

—ভেঙে ফেললি এত সুন্দর ফুলদানিটা? স্কুল থেকে এসেই শুরু করে দিয়েছিস!

—মা আমি ইচ্ছা করে ভাঙিনি।দেখতে গিয়ে পড়ে গেল।

—উফ্ আমি আর পারিনা। তুই যে কবে একটু শান্ত হবি।

নীতা তাড়াতাড়ি সব পরিস্কার করল।না হলে সুজয় যদি এসে যায়। আর দেখে এই অবস্থা। তাহলে নীতাকেই বলবে ছেলেটাকে একটু দেখে রাখতে পারোনা।সবেতে জ্বালা নীতার।

ভাবতে ভাবতেই সুজয় ঘরে চলে আসলো। যদিও তার আগেই নীতা তাড়াতাড়ি সব পরিস্কার করে ফেলেছিল।

—‘গিজারটা চালিয়ে দাও।স্নান করবো।’বলেই সুজয় বারান্দায় গেল তেল মাখতে।

—ঠিক আছে।

নীতা তাড়াতাড়ি গিজার চালিয়ে সুজয়ের খাবার রেডি করতে লাগলো। সুজয়ের আবার সব পরিপাটি না হলে ভীষণ রেগে যায়। যেমন তিনি কাঁচের গ্লাস ছাড়া জল খাবেন না। থালায় যদি এক ফোঁটা জল থাকে তাতেও রেগে যাবে।তাই এই নিয়ে নীতা ভীষণ ভয়ে ভয়ে থাকে। সব কিছু ফেলে আগে সুজয়ের খাওয়ার সব রেডি করে নেয়।

সুজয় স্নান থেকে বেরোলে নীতা টেবিলে খাবার দিয়ে সুজয়ের পাশে বসে। নীতার সঙ্গে সুজয়ের কোনোদিনই একটানা দু’ মিনিট কথা এগোয়না।কারন সুজয় যখন কিছু বলবে তার মাঝখানে কোনো কথা বলা যাবেনা। যদি কিছু প্রশ্ন নীতার থেকেও থাকে তাও বলা যাবেনা। বললেই সুজয় মুখ খারাপ করবে আর তাতেই নীতারও মন খারাপ হয়ে যায়।আর কথা এগোয় না।

— আজ আমি একটু বাজারে যাবো কিছু টাকা দিওনা।

—কেন কি কিনবে?

—ওই যে ছেলে মেয়ের জন্য কিছু পোশাক। ওরা বড় হচ্ছে। শীতের পোশাকগুলো ছোটো হয়ে গিয়েছে।

—ওঃ কত দেব?

—কি করে বলবো কত খরচ হবে।তুমি দাও কিছু,যা লাগবে আন্দাজ করে। আমি অতো গুণে বলতে পারবোনা।

—ঠিক আছে।

বলে যা দিল তাতে নীতা ভাবলো এই টাকায় হয়তো হবেনা।কিন্তু তা মুখ ফুটে বলার সাহস হলোনা।ভাবল,’আমার কাছে কিছু আছে,তাই দিয়েই মিশিয়ে বাজার করে নেব’।দুপুরের খাওয়া সেরে নীতা এখন একটু বিশ্রাম নেওয়ারও সময় পায়না।নীতার বরাবরের অভ্যাস দুপুরে খাওয়ার পর নিয়মিত খবরের কাগজ পড়ার। আর রাতে বিছানায় শুয়ে গল্পের বই পড়া।এখন রাতে গল্পের বই পড়ার বদলে মাঝে মাঝে গান শুনতে ইচ্ছা করে।কিন্তু কোনোটাই এখন নিয়মিত হয়ে ওঠেনা।

বিকেলে ছেলে মেয়েকে নিয়ে বাজারে গিয়ে খুব আনন্দ করে ওদের সব পোশাক কিনলো।মোমো,ফুচকা,পপকর্ন খাওয়ালো।ওরা খুব খুশি। মেয়েতো নীতার বন্ধু হয়ে উঠছে দিন দিন। ছেলেটাও ভীষণ মা ন্যাওটা।মেয়েতো বলেই ফেললো—‘মা ভাগ্যিস বাবা আসেনি’।

নীতা চোখ বড়ো বড়ো করে বলল—কেন?

—ধূর বাবা আসলে এত মজাই হতোনা। বলতো তাড়াতাড়ি কর।আর না ফুচকা খেতে হবেনা,এটা কিনতে হবেনা,ওটা করতে হবে না।

—এই এসব বলতে হয়না। বাবা তো ভালোর জন্যই বলে।এগুলো খাওয়া কি ভালো?

—আচ্ছা মা আমরা কি রোজ খাই। বাবাও কি ছোটো বেলায় এটা ওটা খেতোনা?বাবা যে কেন বোঝেনা?!

অসহায় নীতা কি বোঝাবে আর কি বলবে মেয়েকে ভেবে পায়না।

খুব আনন্দ করে বাজার সেরে বাড়ি ফিরে সুজয়কে নীতা সব জামা দেখতে বললো।জামা কয়েকটা দেখেই বলল—কত গেল?

এই কথায় নীতা বরাবরের মতো আঘাত পেলো।

—কত গেল তোমার জেনে কি লাভ?দেখো জামা গুলো কেমন হয়েছে?

—হুম ভালোই।

বলে সুজয় চলে গেল।নীতা বলার সাহস পেলনা সুজয়ের দেওয়া টাকায় সব বাজার হয়নি। নীতার জমানো টাকার থেকেও খরচ করতে হয়েছে। সুজয় জানলে বলবে,তোমার খরচের হাত বড্ড বেশি।কিন্তু নীতা জানে সে খরচ কেনো করে। ছেলে মেয়েকে একটু আনন্দ দিতে। এখনকার ছেলেমেয়েরা যেমন বছরে বছরে বাবা মার সাথে ঘুরতে যায়।সপ্তাহ শেষে বাবা মার সাথে রেষ্টুরেন্টে খেতে যায়।বাড়ি বা পাড়ার মাঠে ছেলে মেয়েরা একসাথে খেলে।কোনোটাই তার সন্তানরা পায়না।ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের পড়ার চাপ আর এই না পাওয়াতে ছেলে মেয়েরা বড় হোক এটা নীতা কিছুতেই চায়না। উপরন্তু ওরা ছোটো থেকে দেখে আসছে ওদের বাবা ওদেরকে ছোটো বলে বাড়িতে রেখে মাকে নিয়ে ব্যবসায়িক কাজে দেশ -বিদেশ যাচ্ছে। এই সব নিয়ে নীতা খুব ভাবে, কষ্ট পায়।সুজয় ভাবে সন্তানদের যেভাবে বোঝাতে শেখাবে সেভাবেই বুঝতে শিখবে। কিন্তু নীতার ধারনা অন্য।ওরা বুঝলেও ওদের কষ্টটা কিন্তু কমবে না। তাই নীতা যেটুকু সুযোগ পায় তার মধ্যে দিয়েই চেষ্টা করে ওদের আনন্দ দিতে।

নীতা জানেনা কতদিন এইভাবে চলবে।সারাদিন কাজকর্মে একপ্রকার দিন কেটে যায়। রাতের বেলায় নীতা চোখ বুজলেও ঘুম আর তার আসেনা। মনে যত রাজ্যের কষ্টরা ভিড় করে।

এইভাবে চলতে চলতে মেয়ের বিয়ের বয়স হয়ে যায়। নীতার সব অপূর্ণ স্বপ্নের মধ্যে একটা স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। তার মেয়ে আজ গানের জগতে নাম করেছে। আজ সবাই নীতাকে চেনে গায়িকা তন্বিষ্ঠার মা হিসাবে। এটা নীতাকে ভীষণভাবে গর্বিত করে। নীতা সব দুঃখ ভুলে যায় যখন দেখে মেয়ের গান লোকের মুখে মুখে ঘোরে।

আজ নীতার আনন্দ-দুঃখের দিন একই সাথে। আজ তন্বিষ্ঠার বিয়ে।সে আজ তার নাড়ির টান, নাড়ির বন্ধন ছিন্ন করে নিজের সংসারে চলে যাবে। নীতা মনে মনে বলে ওঠে -হ্যাঁরে মা আজ থেকে তোর মা যে বড্ড একা হয়ে পড়বে।কার কাছে সব কথা বলবে। নীতা ভাবে এটাই জীবন। সেও একদিন তার মাকে ছেড়ে এসেছে তার নিজের সংসারে,নতুন একটা পরিবেশে।

—মা, মা,ওমা কি ভাবছো?

তন্বিষ্ঠার ডাকে নীতা তাড়াতাড়ি চোখের জল মুছে মেয়ের দিকে তাকায়।

—বল,কি হয়েছে?ডাকছিস কেন?

—মা তোমাকে বাবা ডাকছে।

—ও,আচ্ছা যাচ্ছি।

সুজয়ও খুব ব্যস্ত আজ।সুজয় আর নীতার সম্পর্কের মধ্যে ভাঁটা পড়লেও সুজয় বাবা হিসেবে ছেলে মেয়ের জন্য যা করার করেছে। হয়তো ওদের সব আশা পূরণ করতে পারেনি। কিন্তু তন্ময় তন্বিষ্ঠাকে কম ভালোবাসেনা।

নীতা গিয়ে দেখে সুজয় বাড়ি ভর্তি লোকজনকে এড়িয়ে নিজের ঘরে সোফায় গা এলিয়ে বসে আছে। নীতাকে দেখে কাছে ডাকলো।

—বসো নীতা।

—বলো ডাকছিলে কেনো?

—বসোনা,আজকালতো আমার কাছেই একটু বসোনা।

—দেখো আজতো বাড়িভর্তি লোকজন।আর কত কাজ কি করে এখন বসি বলোতো। কি বলতে চাও তাড়াতাড়ি বলো।

—নীতা আজ আমার মনটা ভীষণ খারাপ লাগছে।

—মেয়ের জন্য?

—হ্যাঁ,দেখতে দেখতে আমাদের সেই ছোট্ট মেয়েটা আজ কত বড় হয়ে গেল।আর আজ সে আমাদের ছেড়ে চলে যাবে, পর হয়ে যাবে।

—হুম।

—ভাবছি এই এত বড় বাড়িতে কি করে থাকবো।বড্ড ফাঁকা হয়ে যাবে।

—কেন তন্ময় আছেতো।ওর বউ আসবে।সংসার আবার ভরে যাবে।মেয়ে মাঝে মাঝে আসবে।

—কিন্তু আমার মেয়েটাকে তো সবসময় কাছে পাবোনা।

—তুমি এত ভাবছো কেন বলতো। জীবন যেদিকে যেভাবে নিয়ে যাবে সেদিকে সেভাবেই যেতে হবে।

—নাগো আজ বুঝতে পারছি সন্তানদের ছেড়ে থাকার কষ্টটা কি!

নীতা মনে মনে ভাবলো,এই তুমিই একদিন আমার কষ্ট,আমার বাবা মার কষ্টের কথা ভাবনি। বিয়ের পর যখন মন খারাপ করতাম তখন কদিন ভালোবেসেছো,বুঝিয়েছো।কিন্তু সময় যত গড়িয়েছে ততই তুমি পাল্টে গিয়েছো।মা-এর সাথে যদি একটু ফোনে ৫ মিনিটের জায়গায় ১০মিনিট কথা বলেছি তাই নিয়েই অশান্তি। কেন আমি এত ফোনে কথা বলি।

—নীতা শুনছো…

নীতার সম্বিৎ ফেরে।

— জানোতো আজ….

—থাক আর এখন কোনো কথা শুনবোনা।চলো বাইরে চলো।আত্মীয়স্বজন সব চলে এসেছে।

—নীতা একটা কথা বলার ছিল তোমাকে।

—বলো কি বলবে।

—সরি।

—(নীতা অবাক চোখে তাকিয়ে) কেন?!

—সরি নীতা,তুমিও তোমার মা বাবাকে ছেড়ে এসেছো।এখন বুঝতে পারছি সেদিন তারা কত কষ্টে তোমাকে আমার হাতে তুলে দিয়েছিলেন।

—থাকনা এসব কথা,চলো…

—না,নীতা আমাকে বলতে দাও আজ।তোমাকে তোমার মা বাবার সাথে ঠিকমতো কথা পর্যন্ত বলতে দিতামনা।আজ যদি আমার মেয়েকেও…..

বলে সুজয় ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল।

নীতা সুজয়কে সামলে নিল। নিজেকেও সামলে নিল।

—কিসব ভাবছো।আজ সব শুভ শুভ ভাবো।এমন কিছু হবে না।আমাদের মেয়ে খুব সুখি হবে দেখো।তাই যেন হয় নীতা তাই যেন হয়।

নীতা জানলা দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখলো রোদ ঝলমলে নীল আকাশের মধ্যে দিয়ে সাদা তুলোর মতো মেঘগুলো ভেসে যাচ্ছে।আর নীতা শুনতে পেলো, যেতে যেতে বলে যাচ্ছে নীতা তুমি ভালো থাকো,সুখে থাকো।

**************************************

ছবি সৌজন্যে…… Pinterest.com